প্রতিশোধের আগুনে ভস্মীভূত কালী প্রতিমা! কালীপুজোর আগে মাথায় হাত বর্ধমানের প্রতিমাশিল্পীর
**বর্ধমান: চোরকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার জেরেই কি প্রতিশোধ? প্রতিমা তৈরির কারখানায় আগুন লাগানোর অভিযোগে চাঞ্চল্য ছড়াল বর্ধমানের ছোটনীলপুর সুভাষপাড়া এলাকায়।** ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছে একাধিক কালী প্রতিমা, প্রতিমা তৈরির কাঁচামাল ও বিভিন্ন সরঞ্জাম। আগুনের গ্রাস থেকে রেহাই পায়নি একটি গাড়ি এবং এসির পাইপ-সহ অন্যান্য সম্পত্তিও। সামনেই কালীপুজো, তার আগে এমন ঘটনায় কার্যত দিশেহারা প্রতিমাশিল্পী সুবোধ দাস ও তাঁর পরিবার।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, ছোটনীলপুর সুভাষপাড়া এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই চুরি হচ্ছিল বলে অভিযোগ। বিশেষ করে একটি গ্রিল কারখানা থেকেও চুরির ঘটনা ঘটছিল বলে দাবি এলাকাবাসীর। এই পরিস্থিতিতে মঙ্গলবার ভোরে, আনুমানিক ৫টা থেকে সাড়ে ৫টার মধ্যে, এলাকাবাসী একটি টোটো-সহ এক সন্দেহভাজন চোরকে হাতেনাতে ধরে ফেলেন। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে ওই ব্যক্তিকে থানায় নিয়ে যায় বলে জানা গিয়েছে।
কিন্তু চুরির অভিযোগে ওই ব্যক্তিকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া এবং টোটোটি আটকে রাখার ঘটনাকে কেন্দ্র করেই বিবাদের সূত্রপাত বলে দাবি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের। তাঁদের অভিযোগ, সেই ঘটনার প্রতিশোধ নিতেই মঙ্গলবার গভীর রাতে প্রতিমা তৈরির কারখানায় আগুন লাগিয়ে দেয় দুষ্কৃতীরা।
পরিবারের তরফে জানানো হয়েছে, রাত আনুমানিক ২টা ৩০ মিনিট থেকে ২টা ৪৫ মিনিটের মধ্যে আগুন লাগানো হয়। আগুন দেখতে পেয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত ছুটে আসেন এবং আগুন নেভানোর কাজে হাত লাগান। প্রায় দু’ঘণ্টার চেষ্টায় ভোর ৪টা ৩০ মিনিট থেকে ৫টার মধ্যে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে ততক্ষণে কারখানার ভিতরে থাকা প্রতিমা ও অন্যান্য সামগ্রীর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়ে গিয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিমাশিল্পী সুবোধ দাসের ছেলে আবীর দাস ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে জানান, আসন্ন কালীপুজো উপলক্ষে তাঁদের কারখানায় প্রায় ২৫ থেকে ৩৫টি কালী প্রতিমা তৈরির বরাত ছিল। বিভিন্ন বড় ক্লাব ও পুজো কমিটির জন্য প্রতিমাগুলি তৈরি করা হচ্ছিল। প্রতিমা তৈরির কাজও চলছিল জোরকদমে। কিন্তু রাতের অগ্নিকাণ্ডে একের পর এক প্রতিমা পুড়ে নষ্ট হয়ে যাওয়ায় সমস্ত পরিশ্রম কার্যত মাটি হয়ে গিয়েছে।
**কালীপুজোর আগে বড়সড় আর্থিক সংকটের মুখে শিল্পী পরিবার।** প্রতিমা তৈরির জন্য ইতিমধ্যেই বিভিন্ন পুজো কমিটির কাছ থেকে অগ্রিম টাকা নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আগুনে সমস্ত প্রতিমা নষ্ট হয়ে যাওয়ায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বরাত পূরণ করা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ফলে গ্রাহকদের অগ্রিম টাকা ফেরত দেওয়ার চাপও তৈরি হয়েছে।
এই ঘটনায় মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন প্রতিমাশিল্পী সুবোধ দাস। সারা বছরের পরিশ্রম, শিল্পকর্ম এবং আসন্ন উৎসবকে ঘিরে তৈরি হওয়া আশা—এক রাতের আগুনে সবকিছু ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় শোকস্তব্ধ শিল্পী ও তাঁর পরিবার। এত অল্প সময়ের মধ্যে নতুন করে ২৫ থেকে ৩৫টি প্রতিমা তৈরি করে গ্রাহকদের হাতে তুলে দেওয়া সম্ভব কি না, তা নিয়েও দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।
উৎসবের মুখে এই অগ্নিকাণ্ড শুধু একটি পরিবারের আর্থিক ক্ষতিই নয়, তাঁদের দীর্ঘদিনের শিল্পকর্ম ও জীবিকার উপরেও বড় আঘাত বলে মনে করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। যে সময়ে কালীপুজোর প্রস্তুতিতে ব্যস্ত থাকার কথা ছিল শিল্পী পরিবারের, সেই সময়ে তাঁদের এখন ক্ষয়ক্ষতির হিসাব এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় দিন কাটাতে হচ্ছে।
ঘটনার খবর পেয়ে পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে বলে জানা গিয়েছে। কারা এই অগ্নিকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত, সত্যিই প্রতিশোধের উদ্দেশ্যে আগুন লাগানো হয়েছিল কি না এবং ঘটনার পিছনে অন্য কোনও কারণ রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অভিযুক্তদের শনাক্ত করতে তল্লাশি চালানো হচ্ছে।
তবে কালীপুজোর আর বেশি দেরি নেই। তার আগে বর্ধমানের ছোটনীলপুর সুভাষপাড়ায় প্রতিমা তৈরির কারখানায় এই অগ্নিকাণ্ড ঘিরে উদ্বেগ বাড়ছে। এখন দেখার, তদন্তে কী উঠে আসে এবং ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিমাশিল্পী পরিবার কীভাবে এই বিপর্যয় সামলে ওঠে।