কোথাও অভিনব থিম, কোথাও নজরকাড়া আলোকসজ্জা! ইছামতির বুকে রাজবাড়ির অন্দরমহল, দুর্গোৎসবে সম্প্রীতির রঙে মাতল বসিরহাট
**নিজস্ব সংবাদদাতা, বসিরহাট:** কোথাও অভিনব থিম, কোথাও চোখধাঁধানো আলোকসজ্জা, আবার কোথাও ইছামতির বুকে ফুটে উঠেছে প্রাচীন রাজবাড়ির অন্দরমহল। শিল্প, ঐতিহ্য ও সৃজনশীলতার মেলবন্ধনে দুর্গোৎসবকে ঘিরে উৎসবের আবহে মেতে উঠল উত্তর ২৪ পরগনার বসিরহাট মহকুমা। সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে সুন্দরবন সংলগ্ন বিস্তীর্ণ অঞ্চলের বিভিন্ন পুজোমণ্ডপে দর্শনার্থীদের ভিড়ের পাশাপাশি উঠে এল সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য ছবি। ধর্ম-বর্ণের ভেদাভেদ ভুলে একই উৎসবের আনন্দে শামিল হলেন বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ।
দুর্গাপুজো বাঙালির আবেগ, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অন্যতম প্রতীক। আর সেই উৎসবকে কেন্দ্র করেই প্রতি বছর নানা ধরনের পরিকল্পনা ও সৃজনশীল ভাবনায় নিজেদের মণ্ডপ সাজিয়ে তোলেন পুজো উদ্যোক্তারা। বসিরহাটের বিভিন্ন পুজোমণ্ডপেও এবার সেই বৈচিত্র্যের ছাপ স্পষ্ট। কোথাও সামাজিক বার্তা, কোথাও অতীতের ঐতিহ্যকে নতুনভাবে তুলে ধরা, আবার কোথাও আলোকসজ্জা ও মণ্ডপসজ্জার অভিনবত্ব দর্শনার্থীদের নজর কেড়েছে।
## নবারুণ সমাজের পুজোয় সামাজিক দায়বদ্ধতার বার্তা
বসিরহাটের নবারুণ সমাজের দুর্গাপুজোয় এবার বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে সমাজের পিছিয়ে পড়া, দুঃস্থ ও অসহায় মানুষদের পাশে দাঁড়ানোর ভাবনাকে। উৎসবের আনন্দ যাতে সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের কাছে পৌঁছে যায়, সেই বার্তাই তুলে ধরার উদ্যোগ নিয়েছেন পুজো উদ্যোক্তারা।
রুম্ময় ভট্টাচার্য, দেবশ্রী রায়চৌধুরী, রাজেন্দ্র সাহা-সহ ক্লাবের সদস্যদের উদ্যোগে পুজোকে ঘিরে তৈরি হয়েছে বিশেষ আবহ। শুধু মণ্ডপসজ্জা বা প্রতিমা দর্শনের মধ্যেই উৎসবকে সীমাবদ্ধ না রেখে সামাজিক দায়বদ্ধতার বিষয়টিকেও গুরুত্ব দেওয়ার চেষ্টা করেছেন তাঁরা।
উৎসবের সময় সমাজের আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া মানুষদের পাশে দাঁড়ানো এবং তাঁদের মুখে হাসি ফোটানোর বার্তা এই উদ্যোগের অন্যতম আকর্ষণ। পুজোর আনন্দ সবার সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার এই ভাবনা দুর্গোৎসবের মানবিক দিকটিকেও সামনে নিয়ে এসেছে।
## ইছামতি সংঘের মণ্ডপে প্রাচীন রাজবাড়ির অন্দরমহল
অন্যদিকে, বসিরহাটের ইছামতি সংঘের দুর্গাপুজোয় নজর কেড়েছে প্রাচীন রাজবাড়ির অন্দরমহলের আদলে তৈরি মণ্ডপ। পুরনো দিনের রাজকীয় স্থাপত্য, সূক্ষ্ম কারুকার্য এবং ঐতিহ্যবাহী সাজসজ্জার অনুপ্রেরণায় মণ্ডপটিকে সাজিয়ে তোলা হয়েছে। মণ্ডপে প্রবেশ করলেই যেন দর্শনার্থীদের সামনে ভেসে উঠছে অতীতের রাজকীয় পরিবেশের ছবি।
আধুনিকতার ছোঁয়ার পাশাপাশি অতীতের স্থাপত্যশৈলী ও ঐতিহ্যকে তুলে ধরার এই প্রচেষ্টা দর্শনার্থীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণ হয়ে উঠেছে। মণ্ডপসজ্জার পরিকল্পনায় সৌন্দর্য ও ঐতিহাসিক আবহকে একসূত্রে বাঁধার চেষ্টা করেছেন উদ্যোক্তারা।
সৌমেন বন্দ্যোপাধ্যায়, মানচু ঘোষ ও দেবদাস ঘোষ-সহ ক্লাবের সদস্যদের উদ্যোগে গড়ে উঠেছে এই বিশেষ মণ্ডপ। তাঁদের পরিকল্পনায় রাজবাড়ির অন্দরমহলের আদলকে দুর্গোৎসবের আবহের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে প্রতিমা দর্শনের পাশাপাশি মণ্ডপের শিল্পকর্ম ও সাজসজ্জা দেখতেও আগ্রহী হচ্ছেন দর্শনার্থীরা।
## উৎসবের রঙে মিশেছে সম্প্রীতির বার্তা
বসিরহাটের দুর্গোৎসবের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক হল বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। সীমান্তবর্তী এই অঞ্চলে দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে মিলন ও সম্প্রীতির পরিবেশ। পুজোমণ্ডপে দর্শনার্থীদের ভিড়ে ধরা পড়ছে উৎসবের সার্বজনীন রূপ।
ধর্মীয় পরিচয়ের গণ্ডি পেরিয়ে একে অপরের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেওয়া, মণ্ডপে মণ্ডপে ঘুরে প্রতিমা দর্শন এবং আলোকসজ্জা উপভোগ করার মধ্য দিয়ে উৎসবের আনন্দে শামিল হচ্ছেন নানা সম্প্রদায়ের মানুষ। এই ছবিই বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছে, উৎসবের মূল সুর হল মিলন, ভালোবাসা ও পারস্পরিক সৌহার্দ্য।
বসিরহাটের বিভিন্ন পুজোমণ্ডপের নানা মুহূর্ত উঠে এসেছে টেলিভিশনের ক্যামেরায়। অভিনব থিম থেকে ঐতিহ্যবাহী মণ্ডপসজ্জা, সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি—সব মিলিয়ে দুর্গোৎসবের বহুমাত্রিক ছবি ধরা পড়েছে সেখানে।
সব মিলিয়ে, বসিরহাটের দুর্গাপুজো শুধু প্রতিমা দর্শন কিংবা মণ্ডপসজ্জার প্রতিযোগিতায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। শিল্প, ঐতিহ্য, মানবিকতা ও সম্প্রীতির মেলবন্ধনে উৎসব পেয়েছে এক অন্য মাত্রা। ইছামতির বুকে রাজবাড়ির অন্দরমহল হোক কিংবা নবারুণ সমাজের সামাজিক বার্তা—বসিরহাটের পুজোয় উঠে এসেছে একটাই বার্তা, উৎসব সবার, আনন্দও সবার।