কলকাতার থিম পুজোকে টেক্কা! হাড়োয়ার রবীন সংঘ পাঠাগারে ‘দাও ফিরে সে অরণ্য’, মণ্ডপজুড়ে পাখির বাসা ও সবুজের সমারোহ
**নিজস্ব সংবাদদাতা, হাড়োয়া:** কলকাতার নামী থিম পুজোর জৌলুসের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নজর কাড়ছে জেলার দুর্গাপুজোগুলিও। অভিনব ভাবনা, পরিবেশবান্ধব সাজসজ্জা এবং সামাজিক বার্তার মেলবন্ধনে এবার দর্শনার্থীদের আকর্ষণের কেন্দ্রে উত্তর ২৪ পরগনার বসিরহাট মহকুমার হাড়োয়া ব্লকের খাসবালান্ডা সরকারপাড়ার রবীন সংঘ পাঠাগারের দুর্গাপুজো। পুজোর ৯১তম বর্ষে তাদের এবারের ভাবনা **‘দাও ফিরে সে অরণ্য’**। বাঁশ-কঞ্চি দিয়ে তৈরি মণ্ডপ, অসংখ্য পাখির বাসার প্রতিরূপ এবং সবুজের আবহে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে হারিয়ে যেতে বসা অরণ্যের ছবি। প্রকৃতি সংরক্ষণের পাশাপাশি বাল্যবিবাহ রোধ ও সামাজিক সম্প্রীতির বার্তাও তুলে ধরছেন পুজো উদ্যোক্তারা।
### বাঁশ-কঞ্চিতে গড়ে উঠেছে অরণ্য, মণ্ডপজুড়ে পাখির বাসা
রবীন সংঘ পাঠাগারের মণ্ডপে প্রবেশ করলেই দর্শনার্থীদের মনে হবে, তাঁরা যেন পৌঁছে গিয়েছেন এক টুকরো অরণ্যের মধ্যে। মণ্ডপের বিভিন্ন অংশ বাঁশ ও কঞ্চি দিয়ে সাজিয়ে তৈরি করা হয়েছে প্রাকৃতিক পরিবেশের আবহ। গোটা মণ্ডপজুড়ে রয়েছে সবুজের ছোঁয়া। পাশাপাশি বাবুই পাখির বাসা-সহ বিভিন্ন পাখির বাসার প্রতিরূপ দিয়ে সাজানো হয়েছে মণ্ডপের একাধিক অংশ। এমনকী, অরণ্যের পরিবেশকে আরও বাস্তবসম্মত করে তুলতে তৈরি করা হয়েছে সাপের বাসার প্রতিরূপও।
শিল্প ও সৃজনশীলতার মাধ্যমে প্রকৃতির বৈচিত্র্যকে তুলে ধরাই এই থিমের অন্যতম উদ্দেশ্য। ক্রমাগত বনভূমি ধ্বংস, গাছপালা কমে যাওয়া এবং বন্যপ্রাণীদের স্বাভাবিক বাসস্থান হারানোর মতো বিষয়গুলি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে এই অভিনব উদ্যোগ নিয়েছেন উদ্যোক্তারা।
### পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি বাল্যবিবাহ রোধের বার্তা
শুধু মণ্ডপের সৌন্দর্য নয়, রবীন সংঘ পাঠাগারের এবারের পুজোর অন্যতম প্রধান আকর্ষণ সামাজিক সচেতনতার বার্তা। মণ্ডপের বিভিন্ন জায়গায় প্ল্যাকার্ডের মাধ্যমে গাছ লাগানো, প্রকৃতি সংরক্ষণ এবং পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে বাল্যবিবাহের মতো সামাজিক ব্যাধির বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরির উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
পুজোর আনন্দের মধ্য দিয়ে সমাজের গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাগুলি মানুষের সামনে তুলে ধরতে চাইছেন উদ্যোক্তারা। তাঁদের এই উদ্যোগে দুর্গাপুজো শুধুমাত্র ধর্মীয় উৎসব বা বিনোদনের মাধ্যম হয়ে থাকছে না, বরং সামাজিক সচেতনতা প্রচারের একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হিসেবেও উঠে আসছে।
### ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মেলবন্ধন
মণ্ডপের সাজসজ্জায় রয়েছে অতীতের স্মৃতিও। হারিয়ে যেতে বসা মাটির তৈরি বিভিন্ন সামগ্রী এবং পুরনো দিনের আসবাবপত্রের আদলে তৈরি উপকরণ মণ্ডপের আকর্ষণ আরও বাড়িয়েছে। তার সঙ্গে মানানসই আলোকসজ্জায় সাজিয়ে তোলা হয়েছে পুজো প্রাঙ্গণ।
প্রকৃতি, লোকশিল্প, ঐতিহ্য এবং আধুনিক থিমের মেলবন্ধনে তৈরি এই আয়োজন দর্শনার্থীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণ হয়ে উঠেছে। শহরের বড় বাজেটের পুজোর বাইরে গ্রামবাংলার শিল্পী ও উদ্যোক্তারাও যে নিজেদের সৃজনশীলতার মাধ্যমে ব্যতিক্রমী পুজো উপহার দিতে পারেন, এই উদ্যোগ যেন তারই উদাহরণ।
### পুজোর উদ্বোধনে প্রাক্তন সেনাকর্মী অশোক মুখোপাধ্যায়
রবীন সংঘ পাঠাগারের দুর্গাপুজোর উদ্বোধন করেন হাড়োয়ার কৃতী সন্তান তথা প্রাক্তন সেনাকর্মী অশোক মুখোপাধ্যায়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন পুজো কমিটির উদ্যোক্তা সন্দীপন দাস, অভ্র সরকার, শুভঙ্কর বিশ্বাস, শুভেন্দু দাস, পলাশ সরকার, সুব্রত মণ্ডল, কাকুলি দাস, রিমা দাস জানা, প্রিয়া দাস, খেয়ালী ব্যানার্জি সরকার, মধুছন্দা সরকার-সহ অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিরা।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে পুজো উদ্যোক্তা ও স্থানীয় মানুষের মধ্যে উৎসাহ দেখা যায়। ৯১ বছরের ঐতিহ্যকে সামনে রেখে এবারের পুজোকে আরও অর্থবহ করে তুলতে পরিবেশ ও সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার দিকটিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন তাঁরা।
### সুন্দরবনের বাঘ-আক্রান্ত পরিবারের পাশে পুজো কমিটি
এবারের পুজোয় সামাজিক দায়বদ্ধতার আরও একটি মানবিক দিক তুলে ধরেছেন উদ্যোক্তারা। সুন্দরবনের কুমিরমারি এলাকার যেসব মহিলা বাঘের হামলায় তাঁদের স্বামী বা আত্মীয়স্বজনকে হারিয়েছেন, তাঁদের সম্মান জানানো হয়েছে পুজো কমিটির পক্ষ থেকে। পাশাপাশি দুস্থ ও অসহায় মানুষের হাতে নতুন বস্ত্র তুলে দেওয়া হয়।
উৎসবের আনন্দকে সমাজের প্রান্তিক মানুষের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার এই উদ্যোগ পুজোর তাৎপর্যকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। পরিবেশ রক্ষার বার্তার পাশাপাশি সুন্দরবনের বাঘ-আক্রান্ত পরিবারগুলির পাশে দাঁড়িয়ে মানবিকতা ও সহমর্মিতার নজিরও তুলে ধরেছে এই পুজো কমিটি।
### ৯১ বছরের ঐতিহ্যে নতুন ভাবনা
দীর্ঘদিন ধরেই রবীন সংঘ পাঠাগার প্রতি বছর নতুন নতুন থিমের মাধ্যমে দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করার চেষ্টা করে আসছে। এবার ৯১তম বর্ষে ‘দাও ফিরে সে অরণ্য’ থিমের মধ্য দিয়ে পরিবেশ সংরক্ষণ, সামাজিক সম্প্রীতি এবং কুসংস্কারমুক্ত সমাজ গড়ার বার্তা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে তারা।
সব মিলিয়ে, হাড়োয়ার খাসবালান্ডা সরকারপাড়ার রবীন সংঘ পাঠাগারের দুর্গাপুজো প্রমাণ করছে, থিম পুজোর আকর্ষণ শুধু কলকাতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। জেলার প্রত্যন্ত এলাকাতেও শিল্প, সৃজনশীলতা, ঐতিহ্য এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার মেলবন্ধনে গড়ে উঠতে পারে ব্যতিক্রমী পুজো মণ্ডপ। ‘দাও ফিরে সে অরণ্য’ থিমের মাধ্যমে তাই দুর্গাপুজোর আনন্দের পাশাপাশি প্রকৃতিকে বাঁচানো এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধ থাকার বার্তাও ছড়িয়ে দিচ্ছে রবীন সংঘ পাঠাগার।