স্মার্টফোনের বাজারে বড় ধাক্কা! ১৪ বছরের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি, সবচেয়ে বেশি বিপাকে কোন ব্র্যান্ড?
একসময় স্মার্টফোন কেনার জন্য বাজারে ছিল বিপুল চাহিদা। নতুন মডেল এলেই ক্রেতাদের মধ্যে দেখা যেত উৎসাহ। কিন্তু সেই ছবিতে এবার বদলের ইঙ্গিত। স্মার্টফোনের দাম বৃদ্ধি, মেমরি চিপের ক্রমবর্ধমান খরচ এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতায় চাপ— সব মিলিয়ে ধাক্কা খাচ্ছে স্মার্টফোনের বাজার। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের তৃতীয় ত্রৈমাসিকে স্মার্টফোন সরবরাহে উল্লেখযোগ্য পতন হয়েছে। পরিস্থিতি এতটাই উদ্বেগজনক যে, একই সময়ের নিরিখে গত ১৪ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় ধাক্কার মুখে পড়েছে বাজার বলে দাবি করা হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি চাপে রয়েছে কোন সংস্থা? কেনই বা কমছে স্মার্টফোনের চাহিদা?
## কেন কমছে স্মার্টফোনের বিক্রি?
স্মার্টফোনের বাজারে মন্দার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে উঠে আসছে মেমরি চিপের মূল্যবৃদ্ধি। আধুনিক স্মার্টফোন তৈরিতে র্যাম ও স্টোরেজের মতো মেমরি উপাদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই উপাদানগুলির দাম বেড়ে গেলে উৎপাদন খরচও বাড়ে। তার প্রভাব পড়ে শেষ পর্যন্ত ক্রেতাদের পকেটে।
প্রতিবেদনে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে স্মার্টফোনের মেমরি চিপের দাম প্রায় পাঁচ গুণ বেড়েছে। ফলে একাধিক সংস্থা তাদের ফোনের দাম বাড়াতে বাধ্য হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। আগে যে বাজেটে তুলনামূলক ভালো ফিচারের ফোন কেনা যেত, এখন সেই একই বাজেটে পছন্দের মডেল পাওয়া কঠিন হয়ে উঠছে।
এর পাশাপাশি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন খরচ বেড়ে যাওয়া এবং ক্রয়ক্ষমতার উপর চাপও স্মার্টফোনের চাহিদা কমার অন্যতম কারণ হতে পারে। অনেক ক্রেতাই নতুন ফোন কেনার পরিকল্পনা পিছিয়ে দিচ্ছেন। পুরনো ফোন ব্যবহার করেই কাজ চালানোর প্রবণতা বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই বাজারে নতুন স্মার্টফোনের চাহিদা কমে যায়।
## ২০২৬ সালে স্মার্টফোন সরবরাহে বড় পতন
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা কাউন্টারপয়েন্ট রিসার্চের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ত্রৈমাসিকে স্মার্টফোন সরবরাহ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬ শতাংশ কমেছিল। দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকে সেই পতনের হার বেড়ে দাঁড়ায় ১১ শতাংশে।
তৃতীয় ত্রৈমাসিকের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। ওই সময়ে স্মার্টফোন সরবরাহে বার্ষিক হিসাবে ২০ শতাংশ পতনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। একই সময়ের তুলনায় এত বড় পতন গত ১৪ বছরে দেখা যায়নি বলেও দাবি করা হচ্ছে।
এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি, স্মার্টফোন সরবরাহের পরিসংখ্যান এবং ক্রেতাদের কাছে প্রকৃত বিক্রির পরিসংখ্যান এক নয়। ফলে সরবরাহ কমার অর্থ সরাসরি খুচরো বিক্রি একই হারে কমে যাওয়া নয়। বাজারের প্রকৃত পরিস্থিতি বুঝতে দুই ধরনের তথ্যই গুরুত্বপূর্ণ।
## কোন ব্র্যান্ডের অবস্থা সবচেয়ে খারাপ?
বিশ্বের স্মার্টফোন বাজারে প্রতিযোগিতা এখনও তীব্র। তবে বিভিন্ন সংস্থার বাজারের অংশীদারিত্ব এবং সরবরাহের পরিবর্তন বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি ব্র্যান্ডের উপর চাপের ছবি সামনে আসে।
প্রতিবেদনে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিশ্ববাজারে স্যামসাংয়ের অংশীদারিত্ব ২৩ শতাংশ এবং অ্যাপলের ২২ শতাংশ। অন্যদিকে শাওমির বাজারের অংশীদারিত্ব ১০ শতাংশ, অপোর ৯ শতাংশ এবং ভিভোর ৮ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বড় ব্র্যান্ডগুলির মধ্যে শাওমির সরবরাহে সবচেয়ে বেশি পতনের দাবি করা হয়েছে।
- **শাওমি:** সরবরাহ কমেছে প্রায় ৩০ শতাংশ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
- **অপো:** সরবরাহে প্রায় ২০ শতাংশ পতনের দাবি করা হয়েছে।
- **ভিভো:** এই সংস্থার ক্ষেত্রেও সরবরাহ কমার হার প্রায় ২০ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই হিসাব সঠিক হলে শাওমিই আলোচ্য ব্র্যান্ডগুলির মধ্যে সবচেয়ে বেশি চাপে রয়েছে। তবে এই তথ্যকে ভারতের বাজারের পরিসংখ্যান বলে ধরে নেওয়া যাবে না, কারণ এখানে উল্লেখ করা বাজারের অংশীদারিত্ব বিশ্ববাজারের।
## স্যামসাং ও অ্যাপল কি তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে?
বিশ্ববাজারে স্যামসাং ও অ্যাপল শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। দুটি সংস্থার বাজারের অংশীদারিত্ব কাছাকাছি হলেও তাদের ব্যবসার ধরন এবং ক্রেতাদের লক্ষ্যগোষ্ঠী এক নয়।
অ্যাপলের ক্ষেত্রে প্রিমিয়াম স্মার্টফোনের বাজার গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে স্যামসাং বিভিন্ন দামের পরিসরে একাধিক মডেল বিক্রি করে। ফলে বাজারের মন্দা এবং উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির প্রভাব প্রতিটি সংস্থার উপর একইভাবে পড়বে, এমনটা বলা যায় না।
তবে এই দুই সংস্থার বাজারের অংশীদারিত্ব বেশি থাকলেই যে তারা মেমরি চিপের মূল্যবৃদ্ধি বা চাহিদা কমার প্রভাব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত, তা নয়। সামগ্রিক বাজারের গতিপ্রকৃতি এবং সংস্থাগুলির নিজস্ব বিক্রির পরিসংখ্যানই শেষ পর্যন্ত তাদের অবস্থান স্পষ্ট করবে।
## নতুন ফোনের দাম কি আরও বাড়বে?
মেমরি চিপের দাম বেশি থাকলে স্মার্টফোন নির্মাতাদের উৎপাদন খরচ বাড়তে পারে। সেই পরিস্থিতিতে সংস্থাগুলি কয়েকটি পদক্ষেপ নিতে পারে— ফোনের দাম বাড়ানো, কিছু মডেলে ফিচারের পরিবর্তন আনা অথবা কম লাভের মডেলের উৎপাদন কমানো।
এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়তে পারে কম ও মাঝারি দামের স্মার্টফোনের বাজারে। কারণ এই বিভাগে ক্রেতারা সাধারণত দামের সঙ্গে ফিচারের তুলনা করে ফোন কেনেন। অল্প দাম বাড়লেও অনেকের কেনার সিদ্ধান্ত বদলে যেতে পারে।
অন্যদিকে, যাঁরা নতুন ফোন কেনার পরিকল্পনা করছেন, তাঁদের জন্য ব্যাটারি, প্রসেসর, ক্যামেরা, সফটওয়্যার আপডেট এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারযোগ্যতার মতো বিষয়গুলি বিবেচনা করা জরুরি। শুধুমাত্র নতুন মডেল এসেছে বলে ফোন বদলানোর সিদ্ধান্ত না নিয়ে প্রয়োজন ও বাজেটের মধ্যে ভারসাম্য রাখা বুদ্ধিমানের কাজ।
## সামনে কী অপেক্ষা করছে স্মার্টফোনের বাজারে?
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শাওমি, অপো ও ভিভোর মতো সংস্থাগুলি নতুন ফ্ল্যাগশিপ মডেল বাজারে আনার প্রস্তুতি নিচ্ছে। নতুন প্রযুক্তি, উন্নত ক্যামেরা এবং শক্তিশালী প্রসেসরের মতো ফিচার ক্রেতাদের আকর্ষণ করতে পারে। তবে নতুন মডেল বাজারে এলেই সরবরাহ বা বিক্রি দ্রুত বাড়বে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
স্মার্টফোনের বাজার কত দ্রুত ঘুরে দাঁড়াবে, তা অনেকটাই নির্ভর করবে মেমরি চিপের দাম, ফোনের খুচরো মূল্য এবং ক্রেতাদের চাহিদার উপর। উৎপাদন খরচ কমলে সংস্থাগুলি দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবে। অন্যদিকে, খরচ বাড়তে থাকলে বাজারে চাপ আরও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
সব মিলিয়ে, স্মার্টফোন শিল্পের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ। একদিকে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, অন্যদিকে ক্রেতাদের ব্যয়ের ক্ষেত্রে সতর্কতা— এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য খুঁজতে হচ্ছে নির্মাতা সংস্থাগুলিকে। আর এই পরিস্থিতিতে শাওমির মতো ব্র্যান্ডের সরবরাহে বড় পতনের দাবি বাজারের প্রতিযোগিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে।