রথের চাকা গড়াল পুরীতে: জগন্নাথ রথযাত্রার পিছনের আসল গল্প কী, কেন এত ভিড়
আজ, বৃহস্পতিবার ১৬ জুলাই, ওড়িশার পুরীতে শুরু হল বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন ও বৃহৎ রথযাত্রা। প্রভু জগন্নাথ, তাঁর বড় ভাই বলভদ্র ও বোন সুভদ্রা — এই তিন দেবতা মূল মন্দির ছেড়ে তিনটি বিশাল কাঠের রথে চড়ে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে গুণ্ডিচা মন্দিরের উদ্দেশে যাত্রা করেন। পুরীর সরকারি সূত্র ও শ্রীজগন্নাথ মন্দির প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, এই বছর ফেরার যাত্রা 'বহুড়া যাত্রা' পড়েছে ২৪ জুলাই।
হিন্দু মন্দিরে সাধারণত প্রতিষ্ঠিত দেবমূর্তি কখনও গর্ভগৃহের বাইরে বের করা হয় না। পুরীর জগন্নাথ মন্দির এই নিয়মের ব্যতিক্রম বলে সরকারি বিবরণে জানানো হয়েছে। রথযাত্রার দিন দেবতা নিজেই ভক্তদের কাছে নেমে আসেন — এবং এখানেই উৎসবের মূল তাৎপর্য নিহিত বলে দাবি করেন অনুরাগীরা।
সরকারি সূত্র (rathjatra.nic.in) ও শ্রীজগন্নাথ মন্দিরের বিবরণ অনুযায়ী, তিন দেবতার তিনটি আলাদা রথ। জগন্নাথের রথের নাম নন্দীঘোষ — উচ্চতা প্রায় ৪৫ ফুট, ষোলোটি চাকা, লাল-হলুদ কাপড়ে ঢাকা। বলভদ্রের রথ তালধ্বজ — চোদ্দোটি চাকা, উচ্চতা প্রায় ৪৪ ফুট। সুভদ্রার রথ দর্পদলন — বারোটি চাকা, উচ্চতা প্রায় ৪৩ ফুট, লাল-কালো কাপড়ে সাজানো।
প্রতি বছর নতুন করে নির্দিষ্ট গাছের কাঠ দিয়ে এই রথগুলি তৈরি হয় বলে সরকারি বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। বংশানুক্রমিক ছুতোরদের একটি দল এই কাজের হকদার।
যাত্রার আগে একাধিক আচার পালিত হয়। জ্যৈষ্ঠ পূর্ণিমায় দেবতাদের ১০৮ কলস জলে স্নান করানো হয়, যাকে বলে স্নানযাত্রা। প্রচলিত বিশ্বাস, এর পরে দেবতারা 'অসুস্থ' হন এবং কিছু দিন নির্জনবাসে (অনবসর) থাকেন। রথযাত্রার সকালে শঙ্খ ও ঢাকের তালে দেবমূর্তিগুলিকে দুলিয়ে দুলিয়ে রথে তোলা হয় — এই আচারের নাম পহণ্ডি বিজে।
সবচেয়ে আলোচিত আচারটি 'ছেরা পহঁরা'। এই আচারে পুরীর গজপতি মহারাজ নিজে সোনার হাতলযুক্ত ঝাঁটা দিয়ে রথের মেঝে ঝাড়ু দেন ও সুগন্ধি জল ছিটিয়ে দেন বলে একাধিক সূত্রে জানা গেছে। রাজা হয়েও ঈশ্বরের সামনে এই নম্র সেবা প্রতীকীভাবে বোঝায় — ভক্তের চোখে রাজা ও সাধারণ মানুষ সমান।
এরপর হাজার হাজার ভক্ত দড়ি ধরে রথ টেনে নিয়ে যান গুণ্ডিচা মন্দিরের দিকে। জাতি, ধর্ম বা পরিচয় নির্বিশেষে সকলেই এই টানায় অংশ নিতে পারেন বলে সরকারি বিবরণে উল্লেখ আছে।
কেন এই যাত্রা — তা নিয়ে একাধিক পৌরাণিক ব্যাখ্যা প্রচলিত। একটি বহুল-প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, জগন্নাথ প্রতি বছর তাঁর জন্মস্থানে ভাইবোনদের নিয়ে মাসির বাড়ি (গুণ্ডিচা মন্দির) যেতে চান, আর সেই যাত্রারই স্মারক এই উৎসব। অন্য একটি ব্যাখ্যায় বলা হয়, বোন সুভদ্রার ইচ্ছাপূরণে জগন্নাথ ও বলভদ্র তাঁকে রথে চড়িয়ে নগর ভ্রমণে বের হন।
ইতিহাসের দিক থেকে, একাধিক সূত্রের দাবি, পুরীতে এই উৎসবের শিকড় বহু শতাব্দী পুরনো এবং দ্বাদশ শতকের রাজত্বকালের সঙ্গে এর যোগ রয়েছে। কিছু গবেষক আবার জগন্নাথ দেবতার কাঠের, মানুষ বা পশুর আদল-ছাড়া রূপ থেকে এর আদিবাসী উৎসের সম্ভাবনার কথাও বলেন — যদিও এই নিয়ে ভিন্নমত আছে।
পশ্চিমবঙ্গের পাঠকদের কাছে রথযাত্রা অচেনা নয়। উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, শ্রীরামপুরের মাহেশের রথযাত্রা পুরীর পরেই দ্বিতীয় প্রাচীনতম এবং বাংলার প্রাচীনতম রথযাত্রা হিসেবে পরিচিত, যা ১৩৯৬ খ্রিস্টাব্দ থেকে চলে আসছে। ১৯৬০-এর দশক থেকে ইসকনের হাত ধরে রথযাত্রা এখন বিশ্বের নানা শহরেও পালিত হয়।