রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অবসানে সক্রিয় ভারত, মস্কো ও কিয়েভের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ: জয়শঙ্কর
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অবসানে সক্রিয় ভারত, মস্কো ও কিয়েভের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ: জয়শঙ্কর
নয়াদিল্লি: রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান ঘটাতে এবার আরও সক্রিয় কূটনৈতিক ভূমিকা নিতে শুরু করেছে ভারত। যুদ্ধ থামানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলা থেকে এবার এক ধাপ এগিয়ে রাশিয়া ও ইউক্রেন—দুই দেশের সঙ্গেই সরাসরি আলোচনা চালাচ্ছে নয়াদিল্লি। এমনটাই জানিয়েছেন ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর।
জয়শঙ্করের বক্তব্য, দীর্ঘদিন ধরেই ভারত বলে আসছে যে এই সংঘাতের সমাধান যুদ্ধের ময়দানে নয়, বরং আলোচনা, সংলাপ এবং কূটনীতির মাধ্যমেই সম্ভব। তবে বর্তমানে ভারত শুধু এই অবস্থান প্রকাশ করছে না, বরং দুই দেশের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে কিছু নির্দিষ্ট সমস্যা সমাধানের পথও খুঁজছে।
দুই দেশের সঙ্গেই চলছে আলোচনা
মিউনিখ লিডার্স মিটিংয়ে বক্তব্য রাখতে গিয়ে জয়শঙ্কর জানান, রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত নিয়ে ভারতের অবস্থান বরাবরই পরিষ্কার। ভারত চায় যুদ্ধের অবসান হোক এবং আলোচনার মাধ্যমে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান বেরিয়ে আসুক।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের ভূমিকা আরও সক্রিয় হয়েছে। জয়শঙ্করের কথায়, মস্কো এবং কিয়েভ—দুই পক্ষের সঙ্গেই নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।
শুধু যুদ্ধ বন্ধের মতো বড় বিষয় নয়, সংঘাতের কারণে তৈরি হওয়া কিছু তাৎক্ষণিক সমস্যার সমাধান নিয়েও দুই দেশের সঙ্গে কথা বলছে ভারত।
কৃষ্ণসাগর থেকে শস্য ও জ্বালানি—আলোচনায় একাধিক বিষয়
ভারতের কূটনৈতিক উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে কৃষ্ণসাগরে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা। যুদ্ধের কারণে এই অঞ্চলে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল এবং পণ্য পরিবহণ নিয়ে যে সমস্যা তৈরি হয়েছে, তা নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
এর পাশাপাশি শস্য রফতানি, জ্বালানি রফতানি এবং দুই পক্ষের মধ্যে হামলা কমানোর সম্ভাবনা নিয়েও কথাবার্তা চলছে বলে জানিয়েছেন জয়শঙ্কর।
অর্থাৎ ভারত একদিকে দীর্ঘমেয়াদি শান্তির পথ খুঁজছে, অন্যদিকে যুদ্ধের কারণে তৈরি হওয়া বাস্তব ও জরুরি সমস্যাগুলির সমাধানেও দুই পক্ষের মধ্যে যোগাযোগের চেষ্টা করছে।
রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পাশাপাশি ভারত-রাশিয়া সম্পর্ক নিয়েও সম্প্রতি পর্যালোচনা হয়েছে।
বিদেশ মন্ত্রকের পরামর্শদাতা কমিটির বৈঠকে রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের কূটনৈতিক যোগাযোগ, জ্বালানি সহযোগিতা, বাণিজ্য এবং গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট প্রকল্প নিয়ে আলোচনা হয়।
ভারতের অবস্থান হল, রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি ভারতীয় সাধারণ মানুষের স্বার্থ এবং দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
ভারতের উদ্যোগকে গুরুত্ব দিচ্ছে ইউক্রেনও
ভারতের কূটনৈতিক ভূমিকা নিয়ে ইউক্রেনের বিদেশমন্ত্রী আন্দ্রিই সিবিহাও ইতিবাচক মন্তব্য করেছেন।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, যুদ্ধের সমাধানের জন্য বিভিন্ন দেশ যে শান্তি প্রস্তাব দিয়েছে, ইউক্রেন সেগুলি পর্যালোচনা করছে। এর মধ্যে তুরস্ক, মিশর, আমেরিকা এবং ভারতের প্রস্তাবও রয়েছে।
সিবিহার দাবি, আলোচনায় থাকা প্রস্তাবগুলির মধ্যে ভারতের উদ্যোগটি তুলনামূলকভাবে বেশি বিস্তৃত।
এই মন্তব্য থেকে স্পষ্ট, রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও শান্তি আলোচনায় ভারতের সম্ভাব্য ভূমিকার দিকে কিয়েভও নজর রাখছে।
মোদির শান্তি প্রচেষ্টার প্রশংসা পুতিনের
ভারতের উদ্যোগ নিয়ে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনও ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছেন।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির যুদ্ধ শেষ করার প্রচেষ্টার প্রশংসা করে পুতিন জানিয়েছেন, শান্তিপূর্ণ সমাধানের বিষয়ে মোদির কাছে কিছু ভালো ধারণা রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী মোদিও এর আগে একাধিকবার বলেছেন, যুদ্ধের বদলে আলোচনার টেবিলেই সমস্যার সমাধান খুঁজতে হবে।
ভারতের সামনে এখন বড় পরীক্ষা
রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে যুদ্ধ দীর্ঘদিন ধরে চলছে। দুই দেশের অবস্থানের মধ্যে এখনও বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। তাই সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত যুদ্ধ বন্ধ করা সহজ হবে না।
তবে জয়শঙ্করের বক্তব্য থেকে একটি বিষয় পরিষ্কার—ভারত এবার শুধু শান্তির পক্ষে বক্তব্য রাখার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে চাইছে না।
মস্কো ও কিয়েভের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে যুদ্ধের কারণে তৈরি হওয়া বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি ভবিষ্যতে একটি বৃহত্তর শান্তি আলোচনার পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করছে নয়াদিল্লি।
এখন দেখার বিষয়, ভারতের এই সক্রিয় কূটনৈতিক উদ্যোগ রাশিয়া ও ইউক্রেনকে শেষ পর্যন্ত আলোচনার টেবিলে কতটা কাছাকাছি আনতে পারে।