পুজোর মুখে দিঘার সমুদ্র সৈকতে টানা ৬ দিন বন্ধ সব দোকান! কেন এমন সিদ্ধান্ত নিল প্রশাসন?
**দিঘা: দুর্গাপুজোর মুখে পর্যটকদের অন্যতম প্রিয় গন্তব্য দিঘার সমুদ্র সৈকতে টানা ছয় দিন বন্ধ থাকবে সমস্ত দোকানপাট। ১১ অক্টোবর থেকে ১৬ অক্টোবর পর্যন্ত সৈকতের দোকান বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে দিঘা-শঙ্করপুর উন্নয়ন পর্ষদ। পুজোর মরশুমে যখন দিঘায় পর্যটকদের ভিড় বাড়ার কথা, ঠিক সেই সময়ে কেন এমন সিদ্ধান্ত? এর পিছনে রয়েছে প্রশাসনের বিশেষ পরিকল্পনা।**
দুর্গাপুজো মানেই বাঙালির বেড়ানোর মরশুম। কলকাতা-সহ রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বহু মানুষ ছুটি কাটাতে দিঘায় ভিড় করেন। সমুদ্রের ঢেউ উপভোগ করার পাশাপাশি সৈকতের বিভিন্ন দোকানে কেনাকাটা, স্ট্রিট ফুড খাওয়া এবং পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো পর্যটকদের কাছে অন্যতম আকর্ষণ। কিন্তু এ বছর পুজোর ঠিক মুখে দিঘার সমুদ্র সৈকতের সমস্ত দোকান বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে পর্যটক ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে।
## কেন টানা ছয় দিন বন্ধ থাকবে দোকান?
প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে, দিঘায় সরকারি উদ্যোগে দু’দিনের বিশেষ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানের নাম **‘মায়ের আগমনে, আনন্দ দিঘা জুড়ে’**। আগামী ১৪ ও ১৫ অক্টোবর এই অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। সেই অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে দিঘাকে নতুনভাবে সাজিয়ে তোলা হচ্ছে। পাশাপাশি, ভিআইপি ও বিশিষ্ট অতিথিদের উপস্থিতি, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং অনুষ্ঠান পরিচালনার সুবিধার কথা মাথায় রেখেই সমুদ্র সৈকতের দোকানগুলি বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।
দিঘা-শঙ্করপুর উন্নয়ন পর্ষদের ঘোষণা অনুযায়ী, ১১ অক্টোবর থেকে ১৬ অক্টোবর পর্যন্ত সৈকতের দোকানপাট বন্ধ থাকবে। অর্থাৎ, পুজোর আগে এবং অনুষ্ঠানের দিনগুলিতে পর্যটকদের পরিচিত সৈকত এলাকার দোকানগুলি থেকে কেনাকাটা করার সুযোগ সীমিত থাকবে।
## কোথায় হবে ‘মায়ের আগমনে, আনন্দ দিঘা জুড়ে’ অনুষ্ঠান?
সূত্রের খবর, নিউ দিঘায় অবস্থিত জগন্নাথ মন্দির সংলগ্ন এলাকায় এই বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে। অনুষ্ঠানকে ঘিরে ইতিমধ্যেই দিঘার প্রবেশদ্বার থেকে শুরু করে বিভিন্ন এলাকায় সাজসজ্জার কাজ চলছে। আলো, বিভিন্ন মূর্তি, ব্যানার ও হোর্ডিং দিয়ে সাজিয়ে তোলা হচ্ছে পর্যটনকেন্দ্রটিকে।
১৪ ও ১৫ অক্টোবর প্রতিদিন বিকেল ৫টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত চলবে বিভিন্ন অনুষ্ঠান। শঙ্খধ্বনি, ঢাকের বাদ্যি, আতশবাজি এবং সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মাধ্যমে উৎসবের আবহ তৈরি করার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি, দর্শকদের আকর্ষণ বাড়াতে ড্রোন শোয়েরও আয়োজন করা হবে বলে জানা গিয়েছে।
প্রশাসনিক সূত্রে আরও জানা যাচ্ছে, অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকতে পারেন। তবে তাঁর উপস্থিতি সম্পর্কে চূড়ান্ত সরকারি ঘোষণা যাচাই করা প্রয়োজন।
## নিরাপত্তায় বিশেষ নজর প্রশাসনের
দিঘার জেলাশাসক নিরঞ্জন কুমার জানিয়েছেন, ১৪ ও ১৫ অক্টোবরের অনুষ্ঠানে বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি, মন্ত্রী ও শিল্পীর উপস্থিতির সম্ভাবনা রয়েছে। সেই কারণে নিরাপত্তার বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। অনুষ্ঠানস্থল ও সংলগ্ন এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হবে। সমুদ্র সৈকত এলাকায় পুলিশের টহলদারি চলবে এবং বিভিন্ন জায়গায় ব্যারিকেড তৈরি করা হয়েছে।
অনুষ্ঠান চলাকালীন যাতে কোনও অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে এবং অতিথিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়, সেই লক্ষ্যেই গোটা দিঘাকে নিরাপত্তার চাদরে মুড়ে ফেলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলে প্রশাসনিক সূত্রে খবর। দোকান বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তও এই সামগ্রিক প্রস্তুতির অংশ বলে জানা যাচ্ছে।
## ছয় দিন দোকান বন্ধ, চিন্তায় স্থানীয় ব্যবসায়ীরা
প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন সৈকতের ছোট ব্যবসায়ীরা। পর্যটকদের ভিড়ের উপরেই তাঁদের দৈনন্দিন আয়ের বড় অংশ নির্ভর করে। বিশেষ করে পুজোর মরশুমে পর্যটকদের আনাগোনা বাড়লে বিক্রিও বাড়ে। ফলে এই সময়ে টানা ছয় দিন দোকান বন্ধ থাকায় আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা করছেন তাঁরা।
দিঘার সমুদ্র সৈকতে প্রসাধনসামগ্রী বিক্রি করেন তপন সাহু নামে এক ব্যবসায়ী। তাঁর বক্তব্য, দোকানই তাঁর আয়ের একমাত্র ভরসা। এত দিন দোকান বন্ধ থাকলে পুজোর সময় কোনও উপার্জন হবে না। তবুও প্রশাসনের উদ্যোগে এই অনুষ্ঠান আয়োজন করা হচ্ছে বলে পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন তাঁরা।
ছোট ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, পুজোর মতো গুরুত্বপূর্ণ সময়ে দোকান বন্ধ থাকায় সংসার চালানোর ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হতে পারে। প্রশাসনের সিদ্ধান্ত মেনে নিলেও বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা না থাকায় তাঁদের উদ্বেগ কাটছে না।
## সরকারি অনুষ্ঠানে পর্যটক বাড়ার আশায় হোটেল ব্যবসায়ীরা
অন্যদিকে, এই বিশেষ অনুষ্ঠানকে ঘিরে আশার আলো দেখছেন দিঘার হোটেল ব্যবসায়ীরা। তাঁদের মতে, সরকারি উদ্যোগে বড় মাপের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ড্রোন শো এবং উৎসবের আয়োজন হলে পর্যটকদের আকর্ষণ বাড়তে পারে। এর ফলে হোটেলে বুকিং বাড়ার পাশাপাশি সামগ্রিক পর্যটন ব্যবসাতেও গতি আসতে পারে।
নিউ দিঘার হোটেল ব্যবসায়ী টোটোন সাউ জানিয়েছেন, গত কয়েক মাসে দিঘায় পর্যটকদের আনাগোনা তুলনামূলকভাবে কম থাকায় হোটেল ব্যবসা আশানুরূপ হয়নি। তাই প্রশাসনের এই উদ্যোগকে ঘিরে নতুন করে আশাবাদী তাঁরা। পুজোর মরশুমে পর্যটকদের ভিড় বাড়লে হোটেল ব্যবসায় কিছুটা স্বস্তি ফিরতে পারে বলে মনে করছেন তিনি।
## পর্যটকদের জন্য কী বার্তা?
দিঘায় পুজোর ছুটি কাটাতে যাওয়ার পরিকল্পনা থাকলে সমুদ্র সৈকতের দোকান বন্ধ থাকার বিষয়টি মাথায় রাখা জরুরি। ১১ থেকে ১৬ অক্টোবর পর্যন্ত দোকান বন্ধ থাকার ঘোষণার কারণে সৈকত এলাকার কেনাকাটা ও খাবারের দোকানের উপর নির্ভর করে পরিকল্পনা করলে অসুবিধা হতে পারে। তাই যাত্রার আগে হোটেল, খাবারের ব্যবস্থা এবং স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশ সম্পর্কে খোঁজ নেওয়া ভালো।
একদিকে নিরাপত্তা ও সরকারি অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি, অন্যদিকে ছোট ব্যবসায়ীদের আর্থিক উদ্বেগ—দিঘার এই সিদ্ধান্ত ঘিরে তৈরি হয়েছে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া। প্রশাসনের আশা, বিশেষ অনুষ্ঠান পর্যটকদের আকর্ষণ করবে। এখন দেখার, পুজোর মরশুমে এই আয়োজন দিঘার পর্যটন ব্যবসায় কতটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।